এ কথা আমরা সবাই জানি যে শেয়ার বাজারে টাকা বিনিয়োগ করে প্রচুর টাকা ইনকাম করা যায়। শেয়ার বাজার একটি দেশের অর্থনীতিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আপনার কাছে যদি অনেক টাকা থাকে তাহলে সেই টাকা অন্য কোথাও বিনিয়োগ না করে যদি শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করেন তাহলে আপনি প্রচুর লাভবান হতে পারবেন। কিন্তু শুধু বিনিয়োগ করলেই তো হবে না আপনাকে শেয়ার বাজার সম্পর্কে খুঁটিনাটি সব বিষয়ে জানতে হবে না হলে পড়তে হবে চরম বিপদে।
আজকের আর্টিকেলে আমরা শেয়ার বাজার সম্পর্কে খুঁটিনাটি সব তথ্য জানতে চেষ্টা করব।

শেয়ার বাজার কি? what is share market?
শেয়ার অর্থ অংশ আর মার্কেট অর্থ বাজার অর্থাৎ যে বাজারে একটি কোম্পানির অংশ ক্রয়-বিক্রয় করা হয় সেটাকে শেয়ারবাজার বলা হয়। এটি সাধারণত স্টক বা শেয়ার কেনা বেচার একটি জায়গা। কিভাবে আপনি একটি কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার হবেন? আপনি যদি স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে কোন কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করেন তাহলে আপনি সেই কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার হয়ে যাবেন।
চলুন একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া যাক- ধরুন এক্স নামক একটি কোম্পানির 100 টি শেয়ার আছে সেখান থেকে আপনি একটি শেয়ার কিনলেন, তাহলে আপনার অংশীদারিত্ব গিয়ে দাঁড়াবে ওই কোম্পানির 100 ভাগের এক ভাগ। যখন কোম্পানির ভ্যালু বাড়বে তখন আপনার শেয়ারের ভ্যালু বাড়বে আর যখন কোম্পানির ভ্যালু কমবে তখন আপনার শেয়ারের ভ্যালুও কমবে অর্থাৎ আপনি লসে পড়বেন।
বাংলাদেশের কয়টি স্টক এক্সচেঞ্জ আছে?
বাংলাদেশের দুটি স্টক এক্সচেঞ্জ আছে
১) Dhaka Stock Exchange
২) Chittagong Stock Exchange
কোম্পানি কেন শেয়ার বিক্রয় করে?
সাধারণত ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য অর্থ বা মূলধনের প্রয়োজন। কোন কোম্পানি যখন মনে করে তার সেই কোম্পানির বৃদ্ধির জন্য আরো বেশি অর্থ বা মূলধনের প্রয়োজন হবে তখন সেই কোম্পানি শেয়ার বাজারে শেয়ার ইস্যু করে। সাধারণত একটি কোম্পানি মূলধন বা অর্থ কালেকশনের জন্য শেয়ার বাজারে শেয়ার বিক্রয় করে।
চলুন একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হওয়া যায়- ধরুন কোন কোম্পানির 100 কোটি টাকার মূলধন প্রয়োজন কিন্তু কোম্পানির কাছে আছে 50 কোটি। কোম্পানি ওই 50 কোটি টাকা বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার বিক্রয় করবে। ধরুন আপনি সেখান থেকে 5% শেয়ার ক্রয় করলেন। এখন কোম্পানি যদি ব্যবসা করে লাভবান হয় তাহলে আপনি 5% লভ্যাংশ পাবেন ওই কোম্পানির কাছ থেকে।
শেয়ার বাজার কিভাবে কাজ করে?
সাধারণত দুটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে শেয়ারবাজার কাজ করে। বিষয় দুটি হলো demand এবং supply । আচ্ছা আপনারা কি জানেন কেন শেয়ারের দাম বাড়ে কমে বা উঠানামা করে? যদি কোন কোম্পানির চাহিদা বেশি হয় তাহলে সেই কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়িয়ে দেয় অর্থাৎ তখন স্টক মার্কেটে সেই কোম্পানির দাম বেড়ে যায়। আবার যখন কোন কোম্পানির শেয়ার হোল্ডাররা সেই শেয়ার বিক্রি করে দেয় তখন সেই শেয়ারের সরবরাহ বাড়ে আর যখন সেই শেয়ারের সরবরাহ বাড়ে তখন সেই শেয়ারের দাম অটোমেটিক কমে যায়। অর্থাৎ এখানে সাপ্লাই বেশি বলেই সেই শেয়ারের ডিমান্ড কমে যায় অর্থাৎ শেয়ারের দাম কমে যায়।
শেয়ার কত প্রকার?
বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য কোম্পানি বিভিন্ন প্রকার শেয়ার ইস্যু করে থাকে। বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে সাধারণত দুই ধরনের শেয়ার ইস্যু করা হয় একটি হল প্রাইমারি শেয়ার অপরটি হল সেকেন্ডারি শেয়ার
Primary share : যখন কোন কোম্পানি প্রথম শেয়ার বাজারে অন্তর্ভুক্ত হয় বা নিবন্ধিত হয় তখন সেই কোম্পানি যে শেয়ারটি বাজারে ছাড়ে সেই শেয়ার টিকেই প্রাইমারি শেয়ার বলা হয় । এটাকে সাধারণত (IPO)বা ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং ও বলে। এই (IPO) এর মাধ্যমে কোন কোম্পানি প্রথম শেয়ার বাজারে অন্তর্ভুক্ত হয়।
Secondary share : প্রাইমারি শেয়ার বিক্রি হয়ে গেলে সেটা সেকেন্ডারি শেয়ার হয়ে যায়, আর তখন সেটা সেকেন্ডারি মার্কেটে চলে যায় । সাধারণত সেকেন্ডারি শেয়ার গুলো ইচ্ছামত ক্রয় বিক্রয় করা যায়।
সাধারন শেয়ার (Ordinary / Equity Share) :এই শেয়ার হোল্ডারগণ সাধারণ ভিত্তিতে লভ্যাংশ ভোগ করে এবং মূলধন ফেরত পায় অথচ কোম্পানির আইন অনুযায়ী এই শেয়ার হোল্ডারদের কোম্পানির প্রতি দায়িত্ব এবং কর্তব্য বেশি থাকে।
অগ্রাধিকার শেয়ার (Preference Share) : এই শেয়ারের মালিকগণ মূলধন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বা শেয়ারের লভ্যাংশ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বেশি অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে।
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে করণীয় বিষয় সমূহ
অনেকেই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হয়ে যান কারণ তারা সঠিকভাবে পরিকল্পনা এবং সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করেই শেয়ার বাজারে ইনভেস্ট করে থাকে। শেয়ার বাজারে ইনভেস্ট করতে হলে আপনাকে অবশ্যই কিছু বিষয়ের উপর নজর রাখতে হবে। নিচের সে সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
- শেয়ার বাজারে আন্দাজে কখনোই বিনিয়োগ করতে যাবেন না কারণ এটি একটি এনালাইসিসের জায়গা। কোন কোম্পানির শেয়ার কেনার আগে সেই কোম্পানির ফান্ডামেন্টাল ও টেকনিক্যাল এনালাইসিস করুন।
- আমরা সাধারণত শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করি লাভের আশায়,পুঁজি হারানোর জন্য নয়। তাই আপনি যে কোম্পানির শেয়ার কিনবেন শেয়ার কেনার আগে সেই কোম্পানি সম্পর্কে সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর রাখতে হবে । বিগত বছরে কোম্পানিটির লাভ-ক্ষতির হিসাব বের করতে হবে। নিয়মিত পত্রিকা এবং অনলাইন পোর্টাল গুলো পড়তে হবে অর্থাৎ আপনাকে চোখ কান খোলা রাখতে হবে।
- হঠাৎ করে অনেক সময় আপনার শেয়ারের দাম পড়তে পারে । যখন আপনার শেয়ারের দাম পড়তে শুরু করবে তখন আপনি ওই শেয়ারটি লাভের আশায় ধরে রাখবেন না। শেয়ারটি তখন বিক্রি করে দিবেন এবং ওই বিক্রয়কৃত অর্থ দিয়ে আপনি অন্য কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করুন তাতে আপনি লাভবান হতে পারবেন বলে আশা করা যায়।
- মার্কেট কারেকশনের সময় কিছু অর্থ হাতে রেখে ব্যবসা করুন
- কোন শেয়ারের দাম যখন বাড়তে থাকবে তখন সেই শেয়ার টিকে বাই করে তারপর সেল করুন আর যখন কোন শেয়ারের দাম কমতে থাকবে তখন সেই শেয়ার টিকে সেল করে তারপর বাই করুন। এটি হলো বাজারের নিটিং করার পদ্ধতি।
- মাঝে মাঝে আপনার ধরা বাধা কিছু কৌশল পরিবর্তন করে অন্য ধরনের কৌশল খাটান, কারণ সব সময় বাজারে একই ধরনের কৌশল খাটে না।
- কোনো সিদ্ধান্তে আপনার ভুল হতেই পারে তবে দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে আপনার ভুলগুলো শুধরে নেয়ার চেষ্টা করুন।
- যদি কোন শেয়ারের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমে বা বাড়ে তাহলে এর পেছনের কারণগুলো জানতে চেষ্টা করুন, আর গ্যাম্বলার দের পিছনে ভূমিকা আছে কিনা তাও জানতে চেষ্টা করুন। আপনি যদি এই বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে পারেন তাহলে আপনি এরকম প্রতিকূল পরিবেশেও খুব ভালো রকম আয় করতে পারবেন।
- শেয়ার কেনার আগে ইপিএস (EPS) অর্থাৎ Earning Per Share এবং পি ই রেশিও এবং পাশাপাশি বিগত বছরের খতিয়ান ও দেখে নিন।
- প্রত্যেক ব্যবসায়ীর একটি নিজস্বতা থাকে। অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে 10 বার ভেবে নিবেন। শেয়ার কেনাবেচার সময় কোনভাবেই আবেগ তাড়িত হবেন না এবং কোনভাবেই অন্যকে অন্ধভাবে অনুসরণ করবেন না।
- মার্কেট যখন খুব বেশি চাঙ্গা হয়ে উঠবে তখন আপনার হাতে থাকা শেয়ারগুলো ছেড়ে দিন এবং মার্কেট কারেকশন বা মার্কেট পতনের জন্য অপেক্ষা করুন । সাধারণত মার্কেটের এই চাঙ্গা সময়ে মানুষ দর পতনের বিষয়টি মাথায় রাখে না কারণ এটি মানুষের স্বাভাবিক সাইকোলজি।
- আপনি যদি একজন নিয়মিত ট্রেডার হন তাহলে অবশ্যই আপনাকে মার্কেট ট্রেন্ড এর উপর লক্ষ্য রাখতে হবে। দেখা গেল কোন একটি শেয়ারের দাম হঠাৎ করে বাড়ছে আপনি না বুঝে অথবা কোন গুজবে পড়ে আপনি সেটি কিনে ফেললেন। এরপর দেখলেন আপনার শেয়ারটি ম্যাচিউরড হওয়ার আগেই আবার দাম কমতে শুরু করেছে। আর ঠিক এই সময়ে একদল শেয়ার ব্যবসায়ী ঠিকই লাভ করে বেরিয়ে যাবে। তাই কোন শেয়ারে বিনিয়োগের সময় আপনাকে হতে হবে খুব সতর্ক কোন গুজবে কান দিবেন না।